গুগল কর্মবিরতি থেকে কী বার্তা পেল?



অন্যান্য দিনের মতো গত বৃহস্পতিবারও টেক জায়ান্ট গুগলের হাজার হাজার কর্মী কাজের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছিলেন অফিসে। কিন্তু সকালে যেমন সূর্যের তাপ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তেমনি কর্মীদের ক্ষোভ বাড়তে বাড়তে একটা পর্যায়ে বিস্ফোরণে রূপ নেয়।বিশ্বের অন্তত ৫০টি বড় শহরে গুগলের অফিস থেকে ২০ হাজারের মতো কর্মী সকালেই অফিস ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ করেন, দিনব্যাপী ধর্মঘটে যান। প্রতিবাদ করেন নানা সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ভিতরে ঘটা যৌন হয়রানির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিরবতার।ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২৪ অক্টোবর নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ ছিল, তাদের অবসর সুবিধা দিয়েছে গুগল। এমন অভিযোগ ছিল সেই প্রতিবেদনে। তা প্রকাশের পরেই নড়েচড়ে বসেন কর্মীরা। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। যদিও বিষয়টি নিয়ে গুগল কোন কথা বলেনি।

কিন্তু এমন প্রতিবাদে কী বার্তা দিলেন কর্মীরা? এমন প্রশ্ন তারপর থেকেই উঠতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে যে সব কোম্পানি তার অন্যতম গুগল। গুগলের কর্মীরা এমন বিক্ষোভে নেমেছেন এর অর্থ সেখানে কর্মীরা নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না।যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার টেম্পল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ব্রিশেন রজার্স দীর্ঘদিন থেকে ‘কর্মী ও প্রযুক্তি শিল্পের সম্পর্ক’ নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি গুগল কর্মীদের এমন কর্মবিরতির বিষয়ে ভালো করে নজর রেখেছিলেন। বিষয়টিকে তিনি একটু ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেন।রজার্স বলেন, আমি এর আগে কখনো প্রযুক্তি খাতে এমন দৃশ্য দেখিনি। গুগলের যত কর্মী অফিস ছেড়েছেন তার সংখ্যা এবং তাদের স্বতস্ফূর্ততা অবাক করে দেবার মতো। ঠিক উল্টোপিঠ করে দেখলে বলতে হয়, এটা উদ্বেগজনকও বটে।

রজার্স বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি করার স্বপ্ন এখন অনেকেই দেখেন। কারণ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলাদা। তাই প্রত্যাশাও থাকে বেশি।গুগলের একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা আসলেই এমন বিক্ষোভে উদ্বিগ্ন। তবে তারা কোনভাবেই চান না প্রতিষ্ঠানের ভেতর কেউ হেনন্তার শিকার হোক ।সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে হাজার হাজার তরুণ দিন গোনে। সেখানে কোন কাজের অফার পেলে তারা কোন দ্বিধা ছাড়াই হ্যাঁ বলে দেন। বেশি বেতন, এর বাইরে বিভিন্ন সুবিধা সবই দেয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সেসব জায়গায় কর্মীদের দাবি আদায়ে ইউনিয়ন গঠন করতে দেখা যায় না।যুক্তরাজ্য ভিত্তিক স্থানীয় একটি পত্রিকা ‘নিউ সোশ্যালিস্ট’-এর অর্থনীতি বিভাগের সম্পাদক এবং গুগলের সাবেক কর্মী ওন্ডি লিউ বলেন, সামগ্রিকভাবে বিক্ষোভগুলি ‘অবিশ্বাস্যভাবে অনুপ্রেরণামূলক’ ছিল; কারণ, সিলিকন ভ্যালির কর্মীদের মতামত এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো চায়, তাদের কর্মীরা শুধু তাদের দলের একজন সদস্য হবেন না, এর বাইরে তারা যেন প্রতিষ্ঠানটির পরিবারের সদস্য হোন। যেখানে ভালোবাসা, সহমর্মিতার মতো বিষয়গুলোও অটুট থাকে।

কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ পরের দিকে কর্মীদের ভাবাতে বাধ্য করে যে, তারা পরিবারের কেউ নন, বরং তারা শুধুমাত্র কর্মী। ফলে প্রতিষ্ঠান থেকেই তাদের বাধ্য করা হয় এমন বিক্ষোভের দিকে এগুতে, বলেন রজার্স।এমন পরিস্থিতি থেকে নিজেদের দূরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তৃতীয় পক্ষ বা কোন ভেন্ডর ধরে চুক্তিভিত্তিক কাজ করে নেবার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে। ফলে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে চাইলেও চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা সরাসরি সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারছেন না।চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্লুমবার্গ একটি প্রতিবেদনে জানায়, তারাও গুগলের প্যারেন্ট প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটকে এমন কৌশল অবলম্বনের প্রমাণ পেয়েছে। যেখানে অ্যালফাবেটের স্থায়ী কর্মীর চেয়ে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা বেশি। অ্যালফাবেটের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে ৮৫ হাজার ৫০ কর্মী।তবে গুগল কর্মীরা এতটুকু বার্তা দিতে পেরেছেন যে, তারা মুখ বুঁজে নেই। যেকোন ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত। সেটা যদি হয় যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা তাহলে সেটাও ।

Share this:

Post a Comment

 
Copyright © Ak kotha (এক কথা). Designed by OddThemes | Free Blogger Templates